টারান্টুলা – বিদেশি নয় , আতঙ্কিত হবেন না

মাকড়সা নামটি কানে আসা মাত্রই বর্তমানে আমাদের একটি মাকড়সা-র কথাই মাথায় আসে তা হল টারান্টুলা । টারান্টুলা-র কামড়ের জন্য টারান্টুলা এখন সেলিব্রেটি-র থেকে কম নয়, টেলিভিশনে খবরের কাগজে সর্বত্রই এখন টারান্টুলাই শিরোনামে। টারান্টুলা হল এক বিশেষ ধরনের মাকড়সা যাদের চরিত্র কতকটা আদিম প্রকৃতির।

প্রথমে আসা যাক মাকড়সা কোন প্রানী দের বলা হয় ?

সন্ধিপদি (Phylum : Arthropoda) পর্বের অন্তভুক্ত এরানি (Order : Araneae) বর্গের সমস্ত প্রানীদের কেই মাকড়সা বলা হয়। পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত মোট ১১৭ পরিবারের ৪৭৫১৭ টি মাকড়সা বৈজ্ঞানিক ভাবে নথিভুক্ত ও বর্নিত হয়েছে । এরমধ্যে ভারতে কমবেশি প্রায় ৬২ পরিবারের ১৭০০ প্রজাতির মাকড়সা পাওয়া যায়।

এবার আসা যাক টারান্টুলা কাকে বলে বা কিভাবে টারান্টুলা চেনা যায় ?

১১৭ টির মধ্যে Theraphosidae নামের একটি পরিবারের সকল মাকড়সা-দের কে টারান্টুলা বলা হয়ে থাকে।

অন্যান মাকড়সার সাথে টারান্টুলার পার্থক্য :

  • এরা খুব রোমশ মাকড়সা.
  • এদের প্রত্যেটি পায়ের শেষভাগে ঘন রোম-এর প্যাড থাকে ঠিক যেন একটি বিড়ালের মত, আর এরজন্য এদেরকে cat legged spiders ও বলা হয়।
  • এদের স্পিনারেটস (জাল বোনার অঙ্গ) খুব লম্বা হয় অন্যন্য মাকড়সার তুলনায়
  • এদের মুখপাঙ্গে থাকে অনেক কালো কালো বিন্দু, এই বিন্দু গুলো খাবার কে পেষাই করতে কাজে আসে, বৈজ্ঞানিক ভাষায় এই বিন্দু গুলকে বলা হয় কাস্পিউলস ।
  • এদের আটটি সাদা চোখ একসঙ্গে থাকে । অন্য মাকড়সা-র মত ছারা ছারা থাকে না।
  • এদের বিষদাত উপরে ও নিচের দিকে নাড়াচাড়া করতে পারে।

আরও কিছু মাকড়সা রয়েছে (মাইগ্যালোমর্ফ ইনর্ফাওর্ডারের সকল সদস্য) যারাও বিষদাত উপরে ও নিচের দিকে নাড়াচাড়া করতে পারে, তবে বাকি বৈশিষ্টগুলো না থাকায় এদেরকে টারান্টুলা বলা হয় না।

টারান্টুলা কাকে বলে

টারান্টুলা নামটি আসল কেমন করে ?

আজ থেকে প্রায় ৬০০ বৎছর আগে ইতালির দক্ষিন উপকূলে “ট্যারান্টো” নামে একটি ছোট শহর ছিল; সেখানে একধরনের উল্ফ স্পাইডার (Lycosa tarantula যা টারান্টুলা থেকে একদমই আলাদা) পাওয়া যেত ; সেখানকার বাসিন্দারা মনে করত এই মাকড়সা-র কামড়ে মৃত্যু অনিবার্য ; মৃত্যুর থকে বাঁচার একটিই উপায় “ট্যারেনটেলা ” নামের একধরনের বিশেষ সঙ্গীতের তালে তালে উদ্দাম নৃত্য করা (এটি একটি মধ্যযুগীয় কুসংস্কার) , এখান থেকেই টারান্টুলা নামটি এসেছে ।

পৃথিবীর কোথায় কোথায় টারান্টুলা পাওয়া যায় ?

গোটা পৃথিবী জুড়েই (যুক্তরাষ্ট্র , মধ্য আমেরিকা , দক্ষিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ, এসিয়া ও অস্ট্রেলিয়া) জুরে টারান্টুলা র দেখা মেলে।

ভারতেও যে টারান্টুলা পাওয়া যায় সেটা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই জানা আছে। বিবর্তনগতভাবে দেখতে গেলে এরা সেই কার্বোনিফেরাস যুগ থেকেই ভারতে বসবাস করে। বিজ্ঞানের আলোয় প্রথম ভারত থেকে টারান্টুলা বর্ণিত হয় ১৮৯৫ সালে।

পৃথিবী, ভারতবর্ষে ও পশ্চিমবঙ্গে কত ধরনের টারান্টুলা পাওয়া যায়?

এখনও পর্যন্ত গোটা বিশ্বে প্রায় ৯৭৪ প্রজাতির টারান্টুলা র অস্তিত্বের কথা জানা গিয়েছে। এরমধ্যে ভারতে প্রায় ৫৩ প্রজাতির (২০১২ সালের গবেষণা অনুযায়ী) টারান্টুলা পাওয়া যায়, যদিও এর পরে একাধিক নতুন প্রজাতির টারান্টুলা ভারত থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এখন ও পর্যন্ত প্রায় ৭ প্রজাতির টারান্টুলার কথা জানা গিয়েছে । এরা হল Chilobrachys fumosus, Chilobrachys hardwicki, Chilobrachys himalayensis, Chilobrachys khasiensis, Chilobrachys stridulans, Poecilotheria miranda, Selenocosmia sutherlandi

টারান্টুলা বসবাস করার কেমন জায়গা পছন্দ করে?

এরা একাধিক রকমের পরিবেশে বসবাস করে থাকে, যেমন পাহাড় পর্বত , তৃণভূমি , বনভূমি, বর্ষাবন, ও মরুভূমি এমনকি মানুষের বাসস্থানের আশেপাশেও চুপিসারে টারান্টুলা বসবাস করে থাকে । তবে যেখানেই এরা থাকুক না কেন, এরা গর্তবাসি হয়। পছন্দের থাকার জায়গার মধ্যে ঝোপঝাড় পরে না। তাই এরকম ভাবার কোনো নেই বাড়ির পাশে ঝোপঝাড় থাকলেই টারান্টুলা থাকবে। পুরোনো দেয়ালের ফাটল, ইটের পরে থাকা গাদা, পাথরের তলা, পুকুরের পাড় এগুলো টারান্টুলার জন্য আদর্শ স্থান, তবে জায়গাটি একটু স্যাতস্যাতে হওয়াটা জরুরি।

টারান্টুলার স্বভাব ?

এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা দরকার যে টারান্টুলা মোটেও বিরল কোন মাকড়সা নয়, বরং এরা খুবই সাধারন মাকড়সা ও আমাদের ঘরবাড়ির আশেপাশে গরম পড়ার পর আর বর্ষা নামার আগে (বিশেষ করে রাতেরবেলা) টারান্টুলা দেখতে পাওয়া টা খুবই স্বাভাবিক ।

টারান্টুলাা প্রকিতপক্ষে খুবই লাজুক স্বভাবের মাকড়সা , স্বভাবে এরা নিশাচর প্রকৃতির হয় তাই সহজে আমাদের চোখেই পরেনা । সারাবছর চোখে না পরলেও মার্চ থেকে জুলাই এদের খুব সহজেই দেখা যায়। কিন্তু কেন ? কেননা এই সময়টা হল টারান্টুলার প্রজননকাল তাই পুরুষ টারান্টুলারা রাতে স্ত্রী টারান্টুলাকে খুজতে বের হয়। আর স্ত্রী টারান্টুলারা তাদের প্রায় গোটা জীবনকাল গর্তে থেকেই কাটিয়ে দেয় । টারান্টুলার জীবনকাল প্রায় ১৫-২৫ বৎছর পর্যন্ত ও হতে পারে, যা একটি মাকড়সার জন্য অনেকটাই দীর্ঘ আয়ু ।

টারান্টুলার স্বভাব

টারান্টুলার খাদ্য তালিকা কি কি?

টারান্টুলা- ঝিঝিপোকা, শুঁয়োপোকা , অন্যান মাকড়সা এমনকি গিরগিটি , সাপ, ব্যাঙ, ইদুর ও বাদুরকেও খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। অনেক বৈজ্ঞানিক দের মতে কোন কোন প্রজতির টারান্টুলা প্রায় ২ বছর পর্যন্ত না খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে।

টারান্টুলার কামড় ও বিষ ?

টারান্টুলা বিষাক্ত মাকড়সা (তবে Uloboridae পরিবারের মাকড়সা বাদে সব মাকড়সাই বিষাক্ত), তবে আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা বিষাক্ত শব্দটা সাধারণত ব্যবহার করি যে প্রাণীগুলো মানুষের জন্য বিপদজনক তাদের ক্ষেত্রে। সেই দিক দিয়ে বলতে গেলে টারান্টুলার কামড়ে পূর্ণবয়স্ক মানুষের মারা যাবার সম্ভবনা নেই (Rahmani et. al ২০১৪)। এখনো পর্যন্ত মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে যে চাররকম মাকড়সার সন্ধান জানা আছে তার মধ্যেও টারান্টুলা নেই। সেই চার রকমের মধ্যে দুই গণের মাকড়সা পশ্চিমবঙ্গেও পাওয়া যায়। যদিও তাদের দেখতে মোটেও টারান্টুলার মতো দেখনদারী ভয়ঙ্কর নয়। সেই দুটো হলো Latrodectus (Theridiidae) এবং Loxosceles (Sicariidae) (Vassilevski et. al ২০০৯).

পশ্চিমবঙ্গ থেকে দুটো গবেষণাপত্র আছে যাতে টারান্টুলার কামড় নিয়ে (Banerjee et. al ১৯৯৭, Ghosh et. al ২০১৫) এর মধ্যে একটিতে মৃত্যুর উল্লেখ আছে। কিন্তু তারা মৃত্যুর কারন হিসেবে গ্যাংরিন্ কে দায়ী করেছেন।

বিষের প্রকৃতি স্নায়ুবিষ, স্থানীয় ফুলে যাওয়া, ঘা হয়ে যাওয়া ও পচন ও দেখা যায় স্প্রেডিং ফ্যাক্টর hyaluronidase এর তারতম্য অনুযায়ী। বিষ মূলত কাজ করে সোডিয়াম পটাশিয়াম চ্যানেল বন্ধ করার মাধ্যমে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গৌণ সংক্রমণ, হাইপারসেন্সিটিভিটি, বিশেষ এলার্জি শারীরিক অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এরা গায়ের লোম ছোড়ে না, ওটা ল্যাটিন আমেরিকার টারান্টুলারা করে।

চিকিৎসা কি ?

ডাক্তারবাবুর পরামর্শ অনুযায়ীই চিকিৎসা করা উচিত, অধিকাংশ গৌণ সংক্রমণের কারণ নিজে নিজেই চিকিৎসা করতে যাওয়া। ব্যাক্তিগতভাবে আমি এই ব্যাপারে কিছু জানি না, তবে পশ্চিমবঙ্গের অনেক ডাক্তারবাবুই তেমন কোনো ভারতীয় পটভূমির এই ধরণের চিকিৎসা তথ্য অপ্রতুল হওয়া সত্ত্বেও সাফল্যের সঙ্গে সুস্থ করেছেন রোগীদের। Dr. Subhendu Bag (https://www.facebook.com/subhendummc) মহাশয়ের সাফল্য এব্যাপারে সত্যিই প্রশংসনীয়।

শুভঙ্কর দত্ত: ময়নাগুড়ি

References :

  • Ghosh, M., Chakrabortty, S., Mahanayak, B., Ghosh, K., & Talukdar, S. (2015). Spider Bite, a Case from Eastern India with Review of Literature. Toxicology International, 22(3), 153-155.
  • Banerjee, K., Banerjee, R., Mukherjee, A. K., & Ghosh, D. (1997). Tarantula bite leads to death and gangrene. Indian journal of dermatology, venereology and leprology, 63(2), 125-126.
  • Vassilevski, A. A., Kozlov, S. A., & Grishin, E. V. (2009). Molecular diversity of spider venom. Biochemistry (Moscow), 74(13), 1505-1534.
  • Rahmani, F., Khojasteh, S. M. B., Bakhtavar, H. E., Rahmani, F., Nia, K. S., & Faridaalaee, G. (2014). Poisonous spiders: bites, symptoms, and treatment; an educational review. Emergency, 2(2), 54.
  • Pocock, R. I. (1900). The Fauna of British India Including Ceylon and Burma: Published Under the Authority of the Secretary of State for India in Council. Arachnida. Taylor & Francis.
Spread the love

 

Related Post

Leave a Comment